ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্ততঃ ১৮ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নির্দেশে এই হামলা চালানো হয়। তিনি দাবি করেছেন, হামাস যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় আয়োজিত যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করেছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গাজা শহরের সাবরা এলাকায় চারজন এবং খান ইউনিসে পাঁচজন নিহত হয়েছেন।
সর্বমোট ৫০ জনের বেশি আহত হওয়ার খবর গণমাধ্যমসূত্রগুলো জানিয়েছে। পরিস্থিতি ক্রমেই উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠছে বলে জানা গেছে, ফলে যুদ্ধবিরতি চুক্তি বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।
ইসরায়েলের দাবি ও হামলার কারণঃ
নেতানিয়াহুর কার্যালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে— “সাম্প্রতিক নিরাপত্তা পরামর্শের পর প্রধানমন্ত্রী সেনাবাহিনীকে তৎক্ষণাৎ শক্তিশালী হামলা চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন।”
হাসপাতালের পেছনে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা:
গাজা শহর থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক হানি মাহমুদ জানিয়েছেন, আল-শিফা হাসপাতালের পেছনে একটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। তিনি বলেন, “গাজার আকাশে ড্রোন ও যুদ্ধবিমানের তীব্র কার্যক্রম দেখা গেছে। স্থানীয়রা হামলাকে ভয়াবহ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এতে হাসপাতালের রোগী ও কর্মীদের মধ্যে আতঙ্ক ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে।”
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া:
যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেন, “গাজায় ইসরায়েলের হামলার পরও যুদ্ধবিরতি এখনো স্থিতিশীল রয়েছে। ছোটখাটো সংঘাত হতে পারে, তবে প্রেসিডেন্টের মধ্যস্থতায় গঠিত চুক্তি টিকে থাকবে।”
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর হুঁশিয়ারি:
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ দাবি করেছেন, হামাস তাদের সেনাদের লক্ষ্যবস্তু করেছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, “মরদেহ ফেরতের চুক্তি লঙ্ঘনের জন্য হামাসকে কঠিন মূল্য দিতে হবে।”
হামাসের বক্তব্য:
হামাসের রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য সুলাইহ আল-হিন্দি জা্নিয়েছেন, “আমরা চুক্তির প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বন্দিদের মরদেহ উদ্ধার করা আমাদের জন্য কঠিন ছিল। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি, বাকি দায় ইসরায়েলের।”
হামাস আরও জানায়, রাফাহতে সংঘটিত গুলি ও হামলার সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই। বরং তারা ইসরায়েলের হামলাকে “যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন” বলে উল্লেখ করেছে।
রাফাহ সীমান্তে সংঘর্ষ:
রাফাহ সীমান্তে গুলির শব্দ শোনা গেছে, যা ইসরায়েলি সেনা ও ফিলিস্তিনি যোদ্ধাদের মধ্যে সংঘর্ষ বলে ধারণা করা হচ্ছে। পরে সেখানে আর্টিলারি শেলিং ও বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে একজন ইসরায়েলি সেনা আহত হয়েছেন।
আরব বিশ্বের প্রতিক্রিয়া:
হামাস ও ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ ছাড়াও কয়েকটি আরব ও মুসলিম দেশ ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে।
হামাসের সামরিক শাখা জানিয়েছে, “ইসরায়েলের বন্দিদের মরদেহ ফেরত দেওয়া এখন বন্ধ থাকবে। ইসরায়েলের যেকোনো নতুন হামলা মৃতদেহ ফেরতের প্রক্রিয়া বিলম্বিত করবে।”
এছাড়া মঙ্গলবার আরও দুইজন নিহত ইসরায়েলি বন্দির মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
বিশ্লেষকদের মতামতঃ
বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহু শুরু থেকেই যুদ্ধবিরতি চুক্তি নিয়ে উত্তেজনা সৃষ্টি করে আসছেন।
ইউরোপীয় কনসিল অন ফরেন রিলেশনসের বিশ্লেষক মুহাম্মদ শেহাদা বলেন,
“নেতানিয়াহু সীমা পরীক্ষা করছেন। রাফাহ সীমান্ত বন্ধ রেখেছেন, সাহায্য সীমিত করেছেন এবং বারবার হামলা চালাচ্ছেন।”
ইসরায়েলি রাজনৈতিক বিশ্লেষক ওরি গোল্ডবার্গ মনে করেন, “বর্তমান সংঘাত পুরো চুক্তিকে ভাঙবে না। যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য অংশীদার দেশগুলো এতে এতটাই সম্পৃক্ত যে, সহজে চুক্তি বাতিল হবে না।”
দোহা থেকে আল জাজিরার বিশ্লেষক নিদা ইব্রাহিম জানিয়েছেন,
“যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্টভাবে বলেছে— তারা গাজায় নতুন যুদ্ধ শুরু করতে দেবে না।
তবে ইসরায়েল পরিস্থিতি উত্তেজিত করে হামলার সুযোগ তৈরি করতে এবং সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী করতে চাচ্ছে।”

0 মন্তব্যসমূহ