অনেক বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষক মনে করেন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতার উৎস যতটা না প্রযুক্তি বা যুদ্ধাস্ত্র তার চেয়ে অনেক বেশি তাদের মুদ্রা মার্কিন ডলার যা মোটামুটি সারা বিশ্বে প্রভাব রেখে চলেছে । মার্কিন ডলারের উত্থানের পিছনে মূল কারণগুলো হলো: ব্রেটন উডস ব্যবস্থা যা ডলারকে সোনার সাথে সংযুক্ত করেছিল এবং অন্যান্য মুদ্রাকে ডলারের সাথে সংযুক্ত করেছিল, যার ফলে এটি একটি প্রধান রিজার্ভ মুদ্রায় পরিণত হয়। এছাড়াও, বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, প্রাকৃতিক পণ্যের মূল্য নির্ধারণে এর প্রধান ভূমিকা এবং এটিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী ও স্থিতিশীল অর্থনীতি দ্বারা সহযোগীতা করাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
মূল কারণসমূহ:
ব্রেটন উডস ব্যবস্থা (Bretton Woods System): ১৯৪৪ সালের এই চুক্তির অধীনে, মার্কিন ডলারকে সোনার সাথে যুক্ত করা হয় এবং অন্যান্য মুদ্রাকে ডলারের সাথে যুক্ত করা হয়। এটি ডলারকে একটি প্রধান রিজার্ভ মুদ্রা (reserve currency) হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে, যা বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে স্থান করে নেয়। এই ব্যবস্থার অধীনে, মার্কিন ডলার একমাত্র মুদ্রা ছিল যা একটি নির্দিষ্ট হারে (প্রতি আউন্স বা ২.৪৩ ভরি সোনা ৩৫ ডলার) সরাসরি সোনার সাথে রূপান্তরযোগ্য ছিল।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং লেনদেন: আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য মার্কিন ডলার একটি প্রধান মুদ্রা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এটি বিশ্বজুড়ে পণ্য ও পরিষেবার মূল্য নির্ধারণ এবং লেনদেনের জন্য একটি সাধারণ মাধ্যম হয়ে ওঠে।
প্রাকৃতিক পণ্যের মূল্য: তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস এবং সোনার মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক পণ্যের মূল্য ডলারে নির্ধারিত হয়। এর ফলে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি জড়িত না হলেও অনেক আন্তর্জাতিক লেনদেনে ডলার ব্যবহৃত হয়।
অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও শক্তি: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটি শক্তিশালী ও স্থিতিশীল অর্থনীতি হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। একটি ফিয়াট মুদ্রা (fiat currency- যার মূল্য বাজার চাহিদা এবং সরবরাহের উপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়) হিসেবে ডলারের মূল্য এর নিজস্ব স্থিতিশীলতা এবং মার্কিন সরকারের বৈধ দরপত্র (legal tender) ঘোষণার উপর নির্ভর করে।
বিশ্বব্যাপী রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে ব্যবহার: বিশ্বব্যাপী সরকারগুলো তাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ (foreign currency reserves) হিসেবে মার্কিন ডলার ধরে রাখে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে এর অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।
মার্কিন ডলার শক্তিশালী হওয়ার পিছনে সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন মার্কিন ডলারের উত্থান ব্রেটন উডস ব্যবস্থার মাধ্যমে শুরু হলেও বিশ্বব্যাপী তা শক্তিশালী করতে ও এই ধারা বজায় রাখতে সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে, যা প্রধানত ১৯৭০-এর দশকের 'পেট্রোডলার' ব্যবস্থার মাধ্যমে অর্জিত হয়েছিল। এই ব্যবস্থার অধীনে, সৌদি আরব তেলের বিনিময়ে শুধু মার্কিন ডলার গ্রহণ করতে সম্মত হয়েছিল। এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র সৌদিআরবকে সামরিক নিরাপত্তা এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করে।
পেট্রোডলার ব্যবস্থা যেভাবে কাজ করে
ডলারের চাহিদা বাড়ানো: তেলের প্রধান রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে সৌদি আরবের এই চুক্তির ফলে অন্যান্য তেল আমদানিকারক দেশকেও তেল কেনার জন্য মার্কিন ডলারের প্রয়োজনীয়তা বোধ করে এবং রিজার্ভ হিসেবে রাখতে বাধ্য হয়।
ডলারের মজুদ: এই ব্যবস্থা বিশ্বব্যাপী ডলারের চাহিদা বাড়িয়ে দেয়, কারণ অন্য দেশগুলো তেলের মতো অপরিহার্য পণ্য কেনার জন্য ডলার মজুদ করতে বাধ্য হয়। এর ফলে ডলার একটি শক্তিশালী মুদ্রায় পরিণত হয়।
বিনিয়োগে ডলারের ব্যবহার: তেলের বিনিময়ে পাওয়া ডলার, অর্থাৎ পেট্রোডলার, সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগ করে। এই বিনিয়োগ মার্কিন অর্থনীতিকে সহায়তা করে।
অন্যান্য কারণ
সামরিক জোট: যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবের প্রধান সামরিক অংশীদার। এই সামরিক সম্পর্ক উভয় দেশের কৌশলগত স্বার্থ রক্ষা করে, যার মধ্যে পেট্রোডলার ব্যবস্থা বজায় রাখাও অন্তর্ভুক্ত।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক: যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার এবং সৌদি আরব মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম রপ্তানি বাজার। এই অর্থনৈতিক সম্পর্কও ডলারের স্থিতিশীলতাকে বজায় রাখতে সাহায্য করে।

0 মন্তব্যসমূহ